প্রশ্ন : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। সম্মানিত মুফতি সাহেব, আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরয়ী সমাধান জানার জন্য আপনার কাছে আবেদন করছি। আমি বিবাহিত। আমার বাড়ি কালীগঞ্জ এবং আমার শ্বশুরবাড়ি মহেশপুর। ঘটনার দিন আমার ছোট শালা (বয়স ১২ বছর) আমার বাড়িতে বেড়াতে আসবে—এ বিষয়টি আমি আগে জানতাম না। তাকে সকাল ৬টার বাসে পাঠানো হয়। সেদিন সকালে আমি এলার্জির ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। ওষুধের কারণে আমার অনেক ঘুম ছিল এবং ঘুম থেকে ওঠার পর আমি স্বাভাবিক ও সতেজ অবস্থায় ছিলাম না। এর আগের কয়েকদিন ধরেও আমি টাকার সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে মানসিকভাবে অনেক চাপগ্রস্ত, দুর্বল ও বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিলাম। সকাল ৭টার দিকে আমার স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে ডেকে বলে যে, আমার শালাকে কালীগঞ্জ স্ট্যান্ড থেকে নিয়ে আসতে হবে। ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ বিষয়টি জানতে পেরে আমার খারাপ লাগে যে, এত ছোট একটি বাচ্চাকে একা পাঠানো হয়েছে। আমি আমার স্ত্রীকে বলি—তোমার মা-বাবা কীভাবে একা পাঠিয়ে দিলেন, বিষয়টি ঠিক হয়নি। কিন্তু আমার স্ত্রী আমার কথার ভুল অর্থ বুঝে নেয় এবং মনে করে যে, তার ভাই আসায় আমি খুশি নই। এরপর আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে আমার স্ত্রী কিছু কথা বলতে থাকে, যার কারণে আমি প্রচণ্ড রেগে যাই। সেই সময় আমার মানসিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। প্রচণ্ড রাগ, মানসিক চাপ, ঘুমের প্রভাব ও অস্থিরতার মধ্যে মুখে যা আসছিল তাই বলছিলাম। কী বলছি এবং এর পরিণতি কী হবে—সেটা ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছিলাম না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে আমি খুব উত্তেজিত ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় চলে যাই। এরপর আমি নিজের ক্ষতি করার মতো অবস্থায় চলে যাই। পরে আমাকে উদ্ধার করা হয়। এরপর কিছু সময় পর আবারও সেই মানসিক অস্থিরতার মধ্যেই আমি আমার স্ত্রীকে তিন তালাকের শব্দ বলে ফেলি। কিন্তু তালাক বলার সাথে সাথেই আমি চুপ হয়ে যাই। তখন আমার চাচী আমাকে জিজ্ঞেস করেন—তালাক হয়ে গেছে নাকি? তখন আমি বুঝতে পারি বিষয়টি খুবই গুরুতর। এর আগে আমি তালাকের গুরুত্ব ও এর পরিণতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলাম না। ঘটনার কিছু সময় পর আমরা দুজনেই নিজেদের ভুল বুঝতে পারি এবং আবার একসাথে সংসার করতে চাই। আমার স্ত্রীও এখন আমার কাছে ফিরে আসতে চায়। এ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে কোনো লিখিত তালাকনামা, নোটিশ বা অন্য কোনো লিখিত প্রক্রিয়া করা হয়নি। এখন আমার বিনীত প্রশ্ন হলো—এই পুরো ঘটনা, আমার প্রচণ্ড রাগ, মানসিক অস্থিরতা, ঘুমের প্রভাব এবং তালাক বলার সময়কার অবস্থার বিবেচনায় শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাকটি কার্যকর হয়েছে কি না? যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের জন্য করণীয় কী? অনুগ্রহ করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন। জাযাকাল্লাহ খাইরান।

উত্তর :

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ
প্রত্যেক বিবাহিত ও বিবাহিচ্ছুক নর-নারীর জন্য বিবাহ-তালাক সংক্রান্ত জরুরী মাসআলা মাসায়েল জানা অত্যন্ত জরুরী। এ ব্যাপারে অজ্ঞ থাকার কারণে অনেকক্ষেত্রে যেমনিভাবে দুনিয়ার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে তেমনিভাবে আখেরাতের কঠিন আযাবেরও কারণ হয়।

প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী আপনার স্ত্রীর উপর তিন তালাকে মুগাল্লাজা পতিত হয়ে তিনি আপনার জন্য স্থায়ীভাবে হারাম হয়ে গিয়েছেন। শরয়ী হালালাহ ব্যতীত আপনাদের জন্য ঘর সংসার করা, দেখা সাক্ষাত ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। শরয়ী হালালার সূরত হল, স্ত্রীর ইদ্দত পার হবার পর অন্য কোন পুরুষ তাকে বিবাহ করবে। এরপর তাদের মাঝে শারীরিক সম্পর্ক (মেলামেশা) হওয়ার পর সে স্বেচ্ছায় স্ত্রীকে তালাক দিবে। অতঃপর স্ত্রীর ইদ্দত পার হবার পর প্রথম স্বামী অর্থাৎ আপনি চাইলে তার সাথে নতুনভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।

উল্লেখ্য যে, তালাক রাগের মাথায়, হাঁসতে হাঁসতে, ঠাট্টা করত যেভাবেই দেওয়া হোক না কেন তা পতিত হয়। হাদীস শরীফে আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلاَقُ وَالرَّجْعَةُ
অর্থঃ তিনটি জিনিস এমন রয়েছে, গুরুত্ব সহকারে বললেও সংঘটিত হয় এবং ঠাট্টা করে বললেও সংঘটিত হয়। বিবাহ, তালাক ও (এক বা দুই তালাক দেওয়া স্ত্রীকে) ফিরিয়ে নেওয়া।-সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ২১৯৬; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং ১১৮৪

সুত্রসমূহঃ সূরা বাকারাহ, আয়াত ২৩০; সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৭৯২; রদ্দুল মুহতার ৩/২৯৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৪৭৩; মাজমূআতুল ফাতাওয়া ২/৬৮

Loading